জন্ম ও মৃত্যু বিস্ময়কর সত্যের অংশ (২)
রেভারেন্ড নিচিকো নিওয়ানো
প্রেসিডেন্ট, রিস্সো কোসেই-কাই।
小.png)
প্রতিষ্ঠাতার ১২০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে স্মৃতিচারণ
এ বছর আমাদের সংস্থার শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠাতার জন্মের ১২০তম বর্ষ। এ উপলক্ষে কিছুদিন আগে একজন আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন—“সদস্য হিসেবে আমরা প্রতিষ্ঠাতার কোন কথা, কাজ বা মানসিকতাকে অনুসরণ করা উচিত?” আমি তখন আমার মনের কথা খুব সহজভাবে তাঁকে বলেছিলাম—
“প্রত্যেক মানুষের স্বভাব, গুণ এবং জীবনযাপনের ধরন আলাদা। প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন তাঁর নিজের মতো একজন অনন্য মানুষ। আমরাও যেন প্রত্যেকে নিজের স্বভাব ও গুণকে ভালোভাবে কাজে লাগিয়ে অন্যের উপকারে আসতে পারি—এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয় কি?”
শাক্যমুনি বুদ্ধ তাঁর শিষ্যদের ‘আত্মদীপ ও ধর্মদীপ’ প্রজ্জ্বলিত করার শিক্ষা দিয়ে গেছেন। এই শিক্ষার আলোকে, আমরা প্রতিষ্ঠাতার কাছ থেকে যে ধর্মের শিক্ষা পেয়েছি এবং আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে যে বুদ্ধপ্রকৃতি বিদ্যমান, তাকে আশ্রয় করে নিজ নিজ সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষের জন্য কিছু করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেকে নিজের জায়গা থেকে চারপাশের মানুষের জীবনে আলো, মমতা ও উষ্ণতা ছড়িয়ে দিতে পারি।
কিন্তু ‘আত্মদীপ ও ধর্মদীপ’-এর শিক্ষার গুরুত্ব আমরা জানলেও, বাস্তব জীবনে অনেক সময় লোভ, রাগ, অভিমান কিংবা নানা আবেগের কাছে আমরা হার মেনে যাই। তাই শুধু প্রতিষ্ঠাতার জন্মোৎসবের মতো বিশেষ দিনে নয়, প্রতিদিন আমাদের বোধিসত্ত্বের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করা প্রয়োজন। প্রতিটি দিনকে নতুনভাবে শুরু করার এবং নতুন মন নিয়ে জীবনযাপন করার অভ্যাস আমাদের গড়ে তুলতে হবে। এর মাধ্যমে আমি এমন একটি জীবন যাপন করতে চাই, যেখানে নিজের মন ও আচরণের ওপর সংযম বজায় রাখার পাশাপাশি, আমার চারপাশের মানুষদের মধ্যে আলো, মমতা ও ইতিবাচক শক্তি ছড়িয়ে দিতে পারব।
প্রসঙ্গক্রমে, গত মাসে আমি বলেছিলাম “আমরা মহাবিশ্বের সৃষ্টিলগ্ন থেকে প্রবাহিত চিরন্তন জীবনের অংশ হয়ে জীবনযাপন করছি।” সেই চিরন্তন জীবনের ধারায় আমরা এখন মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছি। তবে এই মানবজীবন হলো অবিচ্ছিন্ন ‘চিরন্তন জীবনের’ মধ্যে এক অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী মুহূর্ত মাত্র। সুদূর অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে চলা সময়ের দীর্ঘ রেখায় এটি যেন ক্ষীণভাবে জ্বলে ওঠা একটি ছোট্ট আলোকবিন্দু।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এই অল্প সময়ের জন্য আমরা কেন ‘দুঃখময় সংসার’ বলে পরিচিত এই পৃথিবীতে মানুষ হিসেবে জন্ম নিলাম?
পুণ্ডরীক সূত্রে বলা হয়েছে, আমরা নিজের ইচ্ছায় এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছি। কিন্তু কী উদ্দেশ্যে জন্ম নিয়েছি?—বুদ্ধের মহান সংকল্পকে নিজের জীবনে ধারণ করে, দুঃখ-কষ্টে থাকা মানুষদের সাহায্য ও মুক্তির পথে এগিয়ে দেওয়ার জন্য। তাহলে আমরা এভাবে বিষয়টি বুঝতে পারি—নিজের ও অন্যের দুঃখ যেন সামান্য হলেও কমে যায়, সেই উদ্দেশ্যে সত্য ও সঠিক পথের সন্ধান করা; এবং সবাই যেন পরস্পরের সঙ্গে মিলেমিশে সুখে ও শান্তিতে জীবনযাপন করতে পারে, সেই কামনায় নিষ্ঠার সঙ্গে সাধনা করে যাওয়া—এটাই আমাদের জীবন। আর মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়ার অর্থও এটাই।
আবার কেউ কেউ এই বর্তমান জীবনকে “আত্মবিকাশের জন্য সাময়িক একটি ক্ষেত্র” বলে অভিহিত করেছেন। এই কথাটির সঙ্গে আমার বহুবার বলা—“সাধনা, সাধনা, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সাধনা; আর পুনর্জন্ম হলে আবারও সাধনা”—এই জীবনদর্শনেরও যেন মিল রয়েছে। আমাদের জন্য এই মানবজীবন হলো এমন একটি মূল্যবান সময় ও ক্ষেত্র, যেখানে আমরা জীবনের সুখ-দুঃখকে অনুভব করি এবং সেই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ হিসেবে নিজেদের বিকশিত করি।
বারবার বলছি, এই পৃথিবীতে আমাদের জীবন হলো ‘চিরন্তন জীবনের’ মধ্যে এক ক্ষণিকের মুহূর্ত মাত্র। গত মাসে আমি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক হারুও সাজি’র কথা উল্লেখ করেছিলাম, তিনি বলেছেন—এই ক্ষণিক মুহূর্তের মধ্যেই মানুষের সমগ্র জীবনের অভিজ্ঞতা যেন ঘনীভূত হয়ে আছে। তার ওপর, আমরা যে অমূল্য জীবন লাভ করেছি এবং নিজের ইচ্ছাতেই এই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছি—এই বিষয়টি মনে রাখলে, ছোটখাটো অহংবোধ, ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাব কিংবা নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকার মতো সময় আমাদের হাতে নেই। কারণ, কবি মিয়াজাওয়া কেনজি বলেছেন—“সমগ্র পৃথিবী সুখী না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তিগত সুখ বলে কিছু হতে পারে না।” এই কথাটি এবং বোধিসত্ত্বের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে, মানুষের প্রতি মমতা ও সহানুভূতি না হারিয়ে, আমাদের সঙ্গে একই সময়ে এই পৃথিবীতে বসবাসকারী মানুষদের জীবনে আনন্দ এনে দিতে পারা—মানুষ হিসেবে এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করার সার্থকতা আসলে এটাই।
কবি কোবুতা উৎসুবো তাঁর একটি কবিতায় বলেছেন “শাক্যমুনি বুদ্ধ, নিজেকে মহাবিশ্বের বিশালতার দৃষ্টিতে দেখার শিক্ষা দিয়েছেন, যীশু খ্রিষ্টও করুণার সাথে একই শিক্ষা দিয়েছিলেন।।” যখন আমরা মহাবিশ্বের বিশালতা এবং অনন্তকাল ধরে চলমান জীবনের প্রবাহকে হৃদয়ে ধারণ করি, তখন জন্ম-মৃত্যু নিয়ে আমাদের দুশ্চিন্তা ও ভয়কে অতিক্রম করার শক্তি আসে। একই সঙ্গে, জীবনকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়ে সার্থকভাবে বেঁচে থাকার সংকল্পও আরও দৃঢ় হয়।
প্রেসিডেন্টের ধর্মবাণী (নভেম্বর ২০২৬ইং)