সামনের মানুষটিকেই গুরুত্ব দিন
দ্বিতীয় অধ্যায়
মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন
.jpg)
যেহেতু শাক্যমুনি বুদ্ধ সর্বোচ্চ প্রজ্ঞায় উপনীত হয়েছিলেন, তাই তাঁর অনুগামী হিসেবে আমাদের জন্য বুদ্ধের সেই “প্রজ্ঞা”-র নিকটবর্তী হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো নিষ্ঠার সঙ্গে সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্র অধ্যয়ন করা। এর পাশাপাশি আরেকটি অপরিহার্য বিষয় হলো—করুণাময় হৃদয় গঠন। মৈত্রী-করুণার মধ্যে ‘মৈত্রী’র বিষয়টি সকল জীবের প্রতি বিস্তৃত ও নিরপেক্ষ ভালোবাসার পরিচায়ক। এই সর্বজনীন ভালোবাসাকে হৃদয়ে ধারণ করাই বুদ্ধের মূল প্রতিজ্ঞার আলোকে জীবনযাপনের প্রকৃত অর্থ।
তবে ভালোবাসা এমন এক অনুভূতি, যা স্বাভাবিকভাবেই উৎপন্ন হয়। তাই আমরা ইচ্ছা করলেও প্রত্যেক মানুষের প্রতি সমানভাবে ভালোবাসা অনুভব করতে পারি না। এই কারণে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত—সামনের মানুষটিকেই আন্তরিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া। যার সঙ্গে আমরা কথা বলছি, তিনি সুখী কি না—তা অনুভব করার চেষ্টা করতে হবে। যদি অনুভব করি, তিনি সুখী নন, তবে তাঁর দুঃখ-কষ্টের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া জরুরি। তখন স্বাভাবিকভাবেই এই আকাঙ্ক্ষা জাগে যে, “কীভাবে তাঁর দুঃখ লাঘব করা যায়”—এই আকাঙ্ক্ষা। এটাই করুণার প্রকৃত প্রকাশ।
অবশ্য, কারও দুঃখ দূর করা এত সহজ নয়। তবুও প্রথম পদক্ষেপ হলো—অন্যের কষ্টকে নিজের কষ্টের মতো অনুভব করার মতো হৃদয় গড়ে তোলা। একেই বলা হয় সহানুভূতি ও সহভাগী দুঃখবোধ। এই মনোভাবের সুন্দর প্রতিফলন দেখা যায় জাপানি কবি কেনজি মিয়াজাওয়ার বিখ্যাত কবিতায়—
“দক্ষিণে যদি কেউ মৃত্যুপথযাত্রী থাকে—
ভয় না পেতে, তাকে সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে যাব।
উত্তরে যদি কলহ-বিবাদ ঘটে—
বলব, তা নিরর্থক, থেমে যাও।
খরার দিনে অশ্রু ঝরবে,
শীতের কষ্টে ব্যাকুল হয়ে ঘুরে বেড়াব।”
এই সরল অথচ গভীর মানবিক চেতনার মধ্যেই প্রকাশ পায় “সাধারণ মানুষের বোধিসত্ত্ব জীবন চর্চা”।
আমাদের সামনে যে মানুষটি উপস্থিত হয়, সে কোনো কাকতালীয় নয়; তার সঙ্গে আমাদের গভীর কর্ম-সম্পর্ক রয়েছে। তাই সেই মানুষটির কল্যাণ সাধন করা আমাদেরই দায়িত্ব। কখনোই ভাবা উচিত নয়—“এই মানুষটিকে আর সাহায্য করা সম্ভব নয়।” বুদ্ধ নিজেই এ বিষয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। চুল্লপন্থক ভিক্ষু, যিনি নিজের নাম পর্যন্ত মনে রাখতে পারতেন না, তাঁকে বুদ্ধ একটি সাধারণ কাজ—পরিচ্ছন্নতার অনুশীলন—করতে দিয়েছিলেন। সেই অনুশীলনের মধ্য দিয়েই তিনি শেষ পর্যন্ত জ্ঞানপ্রাপ্তির পথে এগিয়ে যান।
এই পৃথিবীতে এমন কোনো মানুষ নেই, যে মুক্তির অযোগ্য। কারণ প্রত্যেকের মধ্যেই “বুদ্ধ-প্রকৃতি” নামক অমূল্য সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে। কেউ যতই দুঃখ-কষ্টে নিমজ্জিত থাকুক বা নিজেকে যতই অযোগ্য মনে করুক না কেন—যখন সে নিজের এই অন্তর্নিহিত বুদ্ধত্বকে জাগ্রত করতে পারে, তখন তার অন্তর্নিহিত প্রতিভা ও সম্ভাবনা প্রস্ফুটিত হতে শুরু করে।
আমি প্রায়ই বলি—“একজন মানুষ আরেকজন মানুষকে পথ দেখাক।” এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে গভীর তাৎপর্য। কারণ, এর মাধ্যমে আমরা সেই বুদ্ধের কাজে সহায়তা করি, যিনি সকল প্রাণীর মুক্তি কামনা করেন। আর এটাই বুদ্ধের মূল প্রতিজ্ঞার আলোকে জীবনযাপনের সর্বোত্তম পথ।
Bodai no me o okosashimu (Kosei Publishing, 2018), pp. 110–112