চার দুঃখকে অতিক্রম করে, বর্তমানকে নিয়ে বাঁচা

রেভারেন্ড তাকাশি মায়েদা
পরিচালক, রিস্সো কোসেই-কাই আন্তর্জাতিক মিশন।

১২ই আগস্ট, লন্ডন সেন্টারের সদস্য মার্টিন টেলর এবং তাঁর স্ত্রীকে আন্তর্জাতিক বিভাগে স্বাগত জানানো হয়। জনাব টেলর স্কটল্যান্ডে বসবাসকারী একজন বিশ্বখ্যাত গিটারবাদক এবং টোকিওতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে জাপান সফরে এসেছিলেন। বিভাগীয় প্রধান রেভারেন্ড মায়েদা সামনের সারির একেবারে ডানদিকে রয়েছেন।
 

সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা।

বৌদ্ধধর্ম আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানবজীবনে চার প্রকার দুঃখ রয়েছে—জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু। আমাদের প্রতিষ্ঠাতা মহাশয় শিক্ষা দিয়েছেন, বৌদ্ধধর্মের সাধনার মূল ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুকে অতিক্রম করা।”

তাহলে, “অতিক্রম করা” বলতে কী বোঝায়? আমার মনে হয়, এর অর্থ দুঃখকে সম্পূর্ণ দূর করে দেওয়া নয়; বরং এই চার প্রকার দুঃখকে সঙ্গে নিয়েই কীভাবে জীবনযাপন করতে হয়, সেই পথ খুঁজে বের করা।

জন্মদুঃখ হলো এমন এক জীবনের বাস্তবতা, যেখানে সবকিছু আমাদের ইচ্ছা ও প্রত্যাশা অনুযায়ী ঘটে না। কিন্তু আমরা জন্মগ্রহণ করেছি বলেই বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে পারি এবং অসংখ্য সম্পর্ক ও আত্মিক বন্ধন লাভ করি। সেই অর্থে, বেঁচে থাকা মানে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক ও কর্মবন্ধনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলার এক যাত্রা।

জরাদুঃখ হলো শরীরের ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া এবং শক্তি-সামর্থ্য হ্রাস পাওয়া। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতাও বৃদ্ধি পায়। আমরা অন্যের দুঃখ-কষ্ট আরও গভীরভাবে বুঝতে শিখি এবং তাদের প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠতে পারি।

ব্যাধিদুঃখ-ও অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও কষ্টকর। কিন্তু অসুস্থতার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই আমরা সুস্থ থাকার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পারি। পাশাপাশি, আমাদের চারপাশের মানুষ যেভাবে পাশে দাঁড়ান ও সহযোগিতা করেন, সেই ভালোবাসা ও সহমর্মিতার গুরুত্বও গভীরভাবে অনুভব করতে পারি।

আর সবশেষে রয়েছে মৃত্যুদুঃখ। প্রত্যেক মানুষের জীবনই একদিন অনিবার্যভাবে শেষ হয়ে আসে। কিন্তু একদিন আমাদের মৃত্যুবরণ করতে হবে বলেই আজকের এই দিনটিকে আরও মূল্যবান করে তুলতে পারি। জীবনের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করতে পারি বলেই প্রতিটি দিনকে আনন্দ, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বাঁচার প্রেরণা পাই।

জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যু—এই চার প্রকার দুঃখকে আমরা সম্পূর্ণভাবে দূর করতে পারি না। কিন্তু এই দুঃখগুলোর মধ্য দিয়েই জীবনের অমূল্যতা উপলব্ধি করতে পারি এবং অন্যদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ও আত্মিক বন্ধনগুলোকে আরও যত্নের সঙ্গে লালন করতে শিখি।

এভাবে চিন্তা করলে, চার প্রকার দুঃখ হয়তো জীবনকে যন্ত্রণা দেওয়ার “চারটি দেয়াল” নয়; বরং জীবনকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি ও যাপন করার “চারটি প্রবেশদ্বার”।

আমার বিশ্বাস, “জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুকে অতিক্রম করা” মানে দুঃখহীন জীবনের সন্ধান করা নয়; বরং দুঃখের মধ্যেও জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া, প্রতিটি অভিজ্ঞতার অন্তর্নিহিত মূল্য উপলব্ধি করা এবং বর্তমান মুহূর্তটিকে পরিপূর্ণভাবে বাঁচতে শেখা।