প্রত্যেকে একটি করে প্রদীপ জ্বালাই

রেভারেন্ড নিচিকো নিওয়ানো
প্রেসিডেন্ট, রিস্সো কোসেই-কাই।

অন্ধকারের জন্য বিলাপ নয়

আজও পৃথিবীর নানা প্রান্তে অসংখ্য মানুষ যুদ্ধ, সহিংসতা, নিপীড়ন ও অন্যায়ের শিকার হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। এমন এক সময়ে, রোমান ক্যাথলিক চার্চের মহামান্য চতুর্দশ পোপ লিও বিশ্বের সকল রাষ্ট্রনায়কের প্রতি আন্তরিক আহ্বান জানিয়েছেন—“যুদ্ধ বন্ধ করুন এবং শান্তি ও পুনর্মিলন প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালান।” একই সঙ্গে তিনি আরও জোর দিয়ে বলেছেন—“আত্মপূজা ও অর্থপূজা বন্ধ করুন। ক্ষমতা প্রদর্শন বন্ধ করুন। জীবনের সেবায়ই প্রকৃত শক্তি প্রকাশ পায়।”

কিন্তু পরিতাপের বিষয়, এমন নজিরবিহীন সময়েও শান্তির এই আহ্বানের বিরুদ্ধে একটি দেশের নেতা পর্যন্ত সমালোচনার তীর ছুড়েছেন। মানুষের হৃদয় ও ভাষা—যা পারস্পরিক বোঝাপড়া, সম্প্রীতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এক মহামূল্যবান দান—সেই শক্তিই যখন সংঘাত ও অশান্তির অস্ত্র হয়ে ওঠে, তখন তা গভীর বেদনার কারণ হয়। আর আমরা অনেকেই এই বাস্তবতা দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলা এবং অসহায় দর্শক হয়ে থাকা ছাড়া যেন আর কিছুই করতে পারি না।

তবে, এমন এক অন্ধকার ও অনিশ্চিত সময়েও প্রত্যেক মানুষের নিজ নিজ অবস্থান থেকে কিছু করার আছে—এই আশাবাদী আহ্বানই উচ্চারণ করেছেন প্রখ্যাত প্রাচ্য চিন্তাবিদ ইয়াসুওকা মাসাহিরো। তাঁর সুপরিচিত বাণী—“একটি প্রদীপ একটি কোণকে আলোকিত করে; আর অসংখ্য প্রদীপের আলোয় সর্বত্র আলোকিত হয়ে ওঠে।”

“অন্ধকারের জন্য বিলাপ না করে, একটি প্রদীপ জ্বালাই।
প্রথমে নিজের চারপাশের অন্ধকার দূর করার একটি প্রদীপ হয়ে উঠি।
আলো ক্ষীণ হলেও অন্তত একটি কোণকে আলোকিত করি।
আমাদের হাত যতদূর পৌঁছায়, ততদূর পর্যন্ত একের পর এক প্রদীপ জ্বালিয়ে যাই।
একজন যদি একটি প্রদীপ জ্বালায়, তবে দশ হাজার মানুষ মিলে দশ হাজার প্রদীপ জ্বালাতে পারে।
তখন সমগ্র জাপান অচিরেই আলোর দীপ্তিতে ভরে উঠবে।
এটাই আমাদের ‘একটি কোণকে আলোকিত করার সাধনা’; আর সেই সাধনাই একদিন অসংখ্য প্রদীপের আলোয় সমগ্র বিশ্বকে আলোকিত করবে।
আসুন, আন্তরিক নিষ্ঠা ও অটল সংকল্প নিয়ে সমাজ সংস্কারের মহৎ সাধনায় আত্মনিয়োগ করি।”

উক্ত বাণীতে ব্যবহৃত ‘জাপান’ শব্দটির পরিবর্তে ‘বিশ্ব’ শব্দটিই অধিকতর প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ বলে মনে হয়। একইভাবে, সেখানে ব্যবহৃত ‘সমাজ-সংস্কারের সাধনা’ কথাটিও কেবল বৃহৎ কোনো সামাজিক বিপ্লব বা যুগান্তকারী পরিবর্তনের আহ্বান নয়, বরং মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিবেদিত করার এক বাস্তব জীবনচর্চার আহ্বান। যা গত মাসে আলোচিত ‘অন্যের জন্য প্রদীপ জ্বালাও’—এই বাণীরই একটি স্বাভাবিক ও গভীরতর সম্প্রসারণ।

রোমান ক্যাথলিক চার্চের মহামান্য পোপ বলেছেন, “আমাদের মধ্যে যদি সামান্যতম বিশ্বাসও থাকে, তবে আমরা সমগ্র মানবজাতির অংশ হিসেবে, মানবতার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইতিহাসের এই অস্থির ও সংকটময় সময়কে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারি।” আমাদের প্রত্যেকের দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট সৎকর্ম, সহমর্মিতা ও পরোপকারের মনোভাব যেন একটি আলোকবর্তিকার মতো, যা অন্তত একটি কোণকে আলোকিত করতে পারে। যখন কোটি কোটি মানুষ নিজ নিজ জীবনে এমন একটি করে আলোর প্রদীপ প্রজ্বলিত করেন, তখন সেই অসংখ্য আলোকশিখা মিলিত হয়ে সমগ্র পৃথিবীকে আলোকিত করবে। সেদিন এই পৃথিবী—অসীম মহাকাশের অন্ধকারে নীলাভ জ্যোতিতে দীপ্ত এক অনন্য গ্রহে পরিণত হবে।

যতদূর নাগাল পাই

এই বাণীর মধ্যে “যতদূর সম্ভব, সর্বত্র আলোক বর্তিকা জ্বালিয়ে দিই”—এই কথাটিকে “যতটুকু আমাদের সাধ্য ও নাগালের মধ্যে” অর্থে গ্রহণ করলে, আমাদের নিজেদের পক্ষেও সহজে করা সম্ভব এমন ছোট ছোট দান ও সেবামূলক কাজই অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীকে আলোকিত করার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। এইভাবে ভাবলে মনে হয়, এই মাসের ১০ তারিখে আমাদের সংস্থার সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাগানুমা মিয়োকো-এর প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে পালিত ‘কৃতজ্ঞতার স্মরণসভা’-এর দিনটি আসাও হয়তো নিছক কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়।

সহ-প্রতিষ্ঠাতা মিয়োকো নাগানুমা তাঁর সংস্পর্শে আসা প্রত্যেক মানুষকেই নিজের গর্ভজাত সন্তানের মতো আপন করে ভাবতেন। প্রয়োজনে কখনো কঠোর হলেও, তাঁর সেই নির্দেশনা ছিল আন্তরিকতা ও গভীর মমতায় পূর্ণ। তিনি যেন সত্যিই “সর্বত্র আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে যাওয়া”–র করুণাময় সাধনায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেছিলেন। তাঁর সামনে কোনো মানুষকে অসহায় বা অভাবগ্রস্ত অবস্থায় দেখলে তিনি বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে, প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার, বিছানা, অর্থ—এমনকি সেই মুহূর্তে নিজের পরনে থাকা পোশাক পর্যন্ত অকাতরে দিয়ে দিতেন বলে জানা যায়। তিনি নিজের কাছে থাকা সবকিছুকেই “বুদ্ধের কাছ থেকে পাওয়া আশীর্বাদ” বলে মনে করতেন। এভাবেই তিনি একের পর এক মানুষের জীবনে ভালোবাসা ও করুণার আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে গিয়েছিলেন।

আমরা যদি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের দিকে ফিরে তাকিয়ে “হাত যতদূর পৌঁছায়” সেই পরিসরটি দেখি, তাহলে বুঝতে পারি—সেখানে শুধু আমাদের পরিবারের মানুষই নন; আমাদের প্রতিবেশী, ট্রেন বা বাসে পাশে বসা মানুষ, এমনকি দোকানের ক্যাশ কাউন্টারের লাইনে আমাদের সামনে বা পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিও অন্তর্ভুক্ত। এই মানুষগুলোর প্রতি একটি হাসি, একটি কৃতজ্ঞতার কথা কিংবা প্রয়োজনে বিপদগ্রস্ত কারও দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়াও আমাদের চারপাশকে আলোকিত করার একেকটি আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের সদস্যদের প্রতি যত্ন ও কৃতজ্ঞতার কথা যেমন ঘরকে উজ্জ্বল ও উষ্ণ করে তোলার আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে, তেমনি দূর কোনো দেশে দুঃখ-কষ্টের মধ্যে থাকা মানুষের জন্য আন্তরিক প্রার্থনাও এক মূল্যবান আলোকবর্তিকা। আর আজ, দেশ, জাতি ও ধর্মের সব ভেদাভেদ অতিক্রম করে, সারা বিশ্বের মানুষ নিশ্চয়ই একই আকাঙ্ক্ষা নিয়ে প্রার্থনা করছে—শান্তির আলোকবর্তিকা যেন পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

“অন্যের জন্য জ্বালানো আলোকবর্তিকা কখনো নিভে যায় না”—শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠাতার এই বাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে, আসুন আমরা আমাদের হাতের নাগালের ছোট ছোট সেবামূলক কাজগুলো অক্লান্ত ও নিরলসভাবে চালিয়ে যাই।