বুদ্ধের মহান অভিপ্রায়কে ধারণ করে বাঁচা

রেভারেন্ড নিক্কিও নিওয়ানো
প্রতিষ্ঠাতা, রিস্সো কোসেই-কাই।

বুদ্ধের মতো হতে চাই

আমরা সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্র-এর শিক্ষা বিশ্বাস ও গ্রহণ করে ধীরে ধীরে হলেও বোধিসত্ত্বচর্চার সুযোগ পাচ্ছি। এর অর্থ—আমরা এক ধাপ এক ধাপ করে বুদ্ধত্বের পথে, অর্থাৎ বুদ্ধ হওয়ার মহান অভিযাত্রায় অগ্রসর হচ্ছি।

নিশ্চয়ই “বুদ্ধ হওয়া” সহজ নয়। তবে একে অতিরিক্ত দুরূহ মনে না করে, বরং জীবনে প্রয়োগযোগ্যভাবে গ্রহণ করাই অধিকতর ফলপ্রসূ। “বুদ্ধ” শব্দের অর্থ—“জাগ্রত ব্যক্তি”। অর্থাৎ, যিনি জগতের সমস্ত বিষয়কে তার প্রকৃত স্বরূপে উপলব্ধি করতে পারেন এবং নিজের মনের প্রতিটি অবস্থাকে নিখুঁত স্বচ্ছতায় অবলোকন করতে সক্ষম—তিনিই বুদ্ধ।

অন্যদিকে, আমরা সাধারণ মানুষ জগতকে তার প্রকৃত রূপে দেখতে পারি না, আবার নিজের মনকেও সর্বদা সঠিকভাবে স্থির রাখতে পারি না। তাই তথাগত বুদ্ধের শিক্ষা অনুসরণ করে “জাগ্রত ব্যক্তি” হয়ে ওঠার প্রচেষ্টাই হলো বোধিসত্ত্বচর্চা, এবং সেটিই বুদ্ধের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রকৃত উপায়।

এই প্রসঙ্গে, সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্র-এর “উপায়-কৌশল্য অধ্যায়”-এ বুদ্ধ ঘোষণা করেছেন—“আমি আদিতে একটি মহান সংকল্প গ্রহণ করেছিলাম—সকল প্রাণীকে আমার সমকক্ষ করে তুলব, যেন তাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য না থাকে।” অর্থাৎ, তিনি প্রত্যাশা করেন—সমস্ত মানুষ যেন তাঁর মতোই কলুষমুক্ত প্রজ্ঞা ও অপরিমেয় করুণায় পরিপূর্ণ অবস্থায় উপনীত হতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা এই মহান ব্রতকে কীভাবে গ্রহণ করব?

অনেকেই হয়তো মনে করতে পারেন—“এটা তো অসম্ভব; আমরা কখনোই বুদ্ধের মতো হতে পারব না।” কিন্তু অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবলে দেখা যায়—যেহেতু বুদ্ধ নিজেই আমাদের এই সম্ভাবনার নিশ্চয়তা দিয়েছেন এবং সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাই আমরাও অবশ্যই “জাগ্রত ব্যক্তি” হওয়ার পথে অগ্রসর হতে পারি। এই বিশ্বাস, আশা ও কৃতজ্ঞতার সাথে জীবনযাপন করলে জীবন সহজতর, সুশৃঙ্খল ও আনন্দময় হয়ে ওঠে।

আমরা প্রায়ই মনে করি—এই জীবনই সবকিছু; তাই ক্ষণস্থায়ী সুখের পিছনে ছুটে চলি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যতই ভৌত সম্পদ থাকুক না কেন, কেউই জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুর দুঃখ থেকে মুক্ত নয়। তদুপরি, প্রিয়জন থেকে বিচ্ছেদের বেদনা এবং অপছন্দের বিষয়ের সম্মুখীন হওয়ার যন্ত্রণা আমাদের জীবনকে নানাভাবে স্পর্শ করে।

আরও গভীর সত্য হলো—আমাদের জীবন কেবল এই এক জন্মেই সীমাবদ্ধ নয়। তাই এই জীবনে যদি আমরা সামান্য হলেও বোধিসত্ত্বচর্চা করতে পারি, তবে তার শুভফল পরবর্তী জন্মেও প্রভাব ফেলবে। ধীরে ধীরে আমরা স্বার্থপরতার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে অন্যের কল্যাণ চিন্তা করতে সক্ষম এমন এক মহৎ হৃদয়ের দিকে অগ্রসর হব।

অতএব, বুদ্ধ যখন এই মহান সংকল্প ব্যক্ত করেন যে—“সকল প্রাণীকে আমার সমকক্ষ করে তুলব,” তখন এর মাধ্যমে তিনি এটাও নিশ্চয়তা প্রদান করেন যে, প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই বোধিজ্ঞান লাভের সম্ভাবনা বিদ্যমান।

নিওয়ানো নিক্কিও বাণী সংগ্রহ ১,‘বোধিবীজকে জাগ্রত করা’ পৃ. ১০৮-১১০