সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্র ও চতুরার্যসত্যের শিক্ষা
Dr. Dominick Scarangello
International Advisor to Rissho Kosei-kai
দুঃখমুক্তির উপায় আর্যসত্যের অনুশীলন
গত মাসে আমরা চার আর্যসত্যের দ্বিতীয় সত্য দুঃখ সমুদয় আর্যসত্য সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। এই মাসে আমরা দুঃখের নিরোধ বা অবসানের উপায় নির্দেশকারী সত্য— দুঃখমুক্তির উপায় আর্যসত্য নিয়ে চিন্তা করতে চাই।
সাধারণত চার আর্যসত্যের শেষ সত্য হিসেবে দুঃখ নিরোধ আর্যসত্যকে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু একটি বিশেষ কারণে,এই ধারাবাহিক আলোচনার তৃতীয় পর্বে আমরা দুঃখ নিরোধের উপায় আর্যসত্যকে বেছে নিয়েছি। দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যখন আমরা আমাদের উদ্বেগ ও দুঃখ-কষ্টের কারণ বুঝতে শুরু করি (সমুদয় আর্যসত্য), তখন পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সেই দুঃখ থেকে নিজেদের মুক্ত করার জন্য কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং কোন কোন অনুশীলনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, তা জানা। এটাই দুঃখ নিরোধের উপায় আর্যসত্যের মূল তাৎপর্য।
গত মাসে দুঃখের একটি সহজবোধ্য উদাহরণ হিসেবে, আমার যানজটে আটকে পড়ার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছিলাম। সেখানে, কোনো কিছু নিজের ইচ্ছা বা প্রত্যাশা অনুযায়ী না ঘটলে যে দুঃখের জন্ম হয়, সে সম্পর্কে আলোচনা করেছিলাম। এরপর দুঃখ সমুদয় আর্যসত্যের অনুশীলনের মাধ্যমে আমি নিজের দুঃখের পেছনে কীভাবে কারণ ও ফলের ধারাবাহিক সম্পর্ক কাজ করেছিল, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করেছি।
দুঃখ থেকে মুক্ত হতে হলে আমার করণীয় হলো বুদ্ধের শিক্ষাকে জীবনে অনুশীলন করা। দুঃখের কারণ ও তার কার্যকারণ-সম্পর্ক যেমন বহুবিধ, তেমনি দুঃখমুক্তির উপায় আর্যসত্যের অনুশীলনের পথও একরকম নয়। তবে এই মুহূর্তে আমাদের পক্ষে প্রথম যে কাজটি করা সম্ভব, তা হলো—অন্যের ওপর ক্রোধ পোষণ করার মতো আচরণ থেকে বিরত থাকা। পুণ্ডরীক সূত্রের তিনটি সূত্রের অন্যতম অমিতার্থ সূত্রে এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে—“ক্রোধপ্রবণ লোকের মনে সহিষ্ণুতার চেতনা জাগ্রত করা।” আমরা যখন আবেগের বশবর্তী হয়ে পড়ি, তখন যদি নিজের মনের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হতে পারি, তাহলে ক্রোধের বিস্ফোরণ অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। একইভাবে, ক্রোধ বা বিরক্তিকে বাইরে প্রকাশ না করে সংযত রাখতে পারলে অন্যের সঙ্গে সংঘাত এড়ানো যায়। ফলে নিজের এবং আশপাশের মানুষের দুঃখ-কষ্টের কারণ হওয়া থেকেও আমরা বিরত থাকতে পারি।
কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিতে দেখলে, ক্রোধের অনুভূতির মুখোমুখি না হয়ে কেবল সেটিকে দমন করে চললে সেই আবেগ বরং আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। একসময় তা আরও তীব্র বিস্ফোরণের রূপ নিতে পারে। অর্থাৎ, এ ধরনের আত্মসংযম কার্যকর এবং কোনো কোনো পরিস্থিতিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও, তা মূলত জরুরি পরিস্থিতিতে গ্রহণ করা একটি সাময়িক প্রতিকার মাত্র। একে প্রকৃত অর্থে বোধিসত্ত্বের “ক্ষান্তি” বা সহিষ্ণুতা বলা যায় না। প্রতিষ্ঠাতা নিক্কিও নিওয়ানো বলেছেন—“কেউ যদি অন্যের অত্যাচার বা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের সম্মুখীন হয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে তা সহ্য করে, জানবে যে সে নব দীক্ষিত। কিন্তু যারা সিদ্ধিলাভ করেছে, শত কষ্টের মধ্যেও তাদের মন থাকে শান্ত।” (পুণ্ডরীক সূত্রের সরল ব্যাখ্যা, পৃষ্ঠা ১৭০)
পুণ্ডরীক সূত্রের দশম অধ্যায়, “ধর্মপ্রচারক অধ্যায়ে” বলা হয়েছে যে, প্রকৃত ক্ষান্তি বা সহিষ্ণুতার সঙ্গে দুটি শর্ত জড়িত। প্রথমত, সকল মানুষের প্রতি করুণাপূর্ণ হৃদয়ের অধিকারী হওয়া। দ্বিতীয়ত, সবকিছুকে সমান দৃষ্টিতে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করা। যদি আমি নিজের করুণার পরিধি প্রসারিত করতে পারি এবং মানুষকে সমতার দৃষ্টিতে দেখতে শিখি, তাহলে যানজটে আটকে পড়ার মতো কিংবা এ ধরনের অন্য কোনো অসুবিধাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেও আশপাশের মানুষকে শত্রু হিসেবে দেখব না। বরং স্বাভাবিকভাবেই অনুভব করতে পারব—“এই মানুষগুলোও তো আমার মতোই সমস্যায় পড়েছেন, তাঁরাও কষ্ট পাচ্ছেন।” এই উপলব্ধি থেকেই অন্যের অনুভূতির প্রতি সহমর্মিতা জন্ম নেয়।
তাহলে করুণাপূর্ণ হৃদয় ও সমতার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে আমাদের কী ধরনের সাধনা করা প্রয়োজন? এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো—পুণ্ডরীক সূত্রের তিনটি সূত্রের সমাপনী সূত্র বুদ্ধভাষিত সমন্তভদ্র বোধিসত্ত্বের তপস্যাবিধি সূত্র (অনুতাপের সূত্র)-এ বর্ণিত শিক্ষাকে জীবনে প্রয়োগ করা। সেখানে বলা হয়েছে—“সকল মানুষকে এমনভাবে দেখো, যেন তাঁরা বুদ্ধ; আর সকল জীবের প্রতি এমন মনোভাব পোষণ করো, যেন তাঁরা তোমার পিতা-মাতা।” অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষকে বুদ্ধের মতো শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা এবং সকল প্রাণীকে নিজের পিতা-মাতার মতো মনে করা—এটাই করুণার মন বিকাশের একটি মৌলিক সাধনা। তাছাড়া, প্রতিদিনের সূত্রপাঠ শেষে আমরা যখন পুণ্য উৎসর্গ করি, তখন সেই প্রার্থনার শেষে কোনো দুঃখ-কষ্টে থাকা পরিচিত ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করে তাঁর সুখ ও কল্যাণ কামনা করা এবং তাঁর দুঃখের অবসান প্রার্থনা করাও করুণার মন গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। আরও একটি উপায় হলো, নিজের প্রার্থনাকে বাস্তব কাজের মধ্যে রূপ দেওয়া। অন্যের উপকারে আসে এমন কাজ করা—অর্থাৎ সাধারণভাবে যাকে দান বা দানশীলতার অনুশীলন বলা হয়—তাও অন্যের সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতি গড়ে তোলে এবং করুণা ও সমদৃষ্টির বিকাশে সহায়তা করে।
তাহলে করুণাপূর্ণ হৃদয় ও সমতার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে আমাদের কী ধরনের সাধনা করা প্রয়োজন? এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো—পুণ্ডরীক সূত্রের তিনটি সূত্রের সমাপনী সূত্র বুদ্ধভাষিত সমন্তভদ্র বোধিসত্ত্বের তপস্যাবিধি সূত্র (অনুতাপের সূত্র)-এ বর্ণিত শিক্ষাকে জীবনে প্রয়োগ করা। সেখানে বলা হয়েছে—“সকল মানুষকে এমনভাবে দেখো, যেন তাঁরা বুদ্ধ; আর সকল জীবের প্রতি এমন মনোভাব পোষণ করো, যেন তাঁরা তোমার পিতা-মাতা।” অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষকে বুদ্ধের মতো শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখা এবং সকল প্রাণীকে নিজের পিতা-মাতার মতো মনে করা—এটাই করুণার মন বিকাশের একটি মৌলিক সাধনা। তাছাড়া, প্রতিদিনের সূত্রপাঠ শেষে আমরা যখন পুণ্য উৎসর্গ করি, তখন সেই প্রার্থনার শেষে কোনো দুঃখ-কষ্টে থাকা পরিচিত ব্যক্তির নাম উচ্চারণ করে তাঁর সুখ ও কল্যাণ কামনা করা এবং তাঁর দুঃখের অবসান প্রার্থনা করাও করুণার মন গড়ে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুশীলন। আরও একটি উপায় হলো, নিজের প্রার্থনাকে বাস্তব কাজের মধ্যে রূপ দেওয়া। অন্যের উপকারে আসে এমন কাজ করা—অর্থাৎ সাধারণভাবে যাকে দান বা দানশীলতার অনুশীলন বলা হয়—তাও অন্যের সঙ্গে একাত্মতার অনুভূতি গড়ে তোলে এবং করুণা ও সমদৃষ্টির বিকাশে সহায়তা করে।

এই সমস্ত অনুশীলনের উদ্দেশ্য হলো বোধিসত্ত্বের পথে এগিয়ে চলা। ক্রোধ প্রশমিত করার জন্য এগুলো প্রয়োজনীয় সাধনা। তবে ক্রোধকে সম্পূর্ণ নির্মূল করার বিষয়টিকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে আঁকড়ে ধরে থাকা ঠিক নয়। কারণ, ক্রোধকে দূর করার জন্য অতিরিক্তভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়লে মন ক্রোধের প্রতি প্রতিক্রিয়ার এক অবিরাম চক্রের মধ্যে আটকে যেতে পারে।
শ্রদ্ধেয় প্রতিষ্ঠাতা এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন—“যতক্ষণ মনে মনে ভাবতে থাকি, ‘ক্লেশ থেকে মুক্ত হব, ক্লেশ থেকে মুক্ত হব’, ততক্ষণ মন ক্লেশ নামক ধারণার সঙ্গেই আটকে থাকে। ফলে কোনোভাবেই সম্পূর্ণভাবে তা থেকে মুক্ত হওয়া সম্ভব হয় না।”
এ ছাড়া, নিজের ভেতরের ক্রোধকে যদি কেবল “দূর করতে হবে এমন শত্রু” হিসেবে দেখি, তাহলে সেই ক্রোধের গভীরে যে করুণার বীজ লুকিয়ে আছে, তা আর দেখতে পাই না। অর্থাৎ, “নরকলোকের” মধ্যেও যে “বোধিসত্ত্বজগৎ” বিদ্যমান, সেই সত্য উপলব্ধি করার সুযোগ হারিয়ে ফেলি। আমার নিজের ক্রোধও ছিল যথেষ্ট অপরিণত ও শিশুসুলভ। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝতে পারি, সেই ক্রোধের মধ্যেও নিজের প্রতি এক ধরনের করুণার অনুভূতি কাজ করছিল। শৈশবে নির্ধারিত সময়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে না পারার কারণে যে কষ্টকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা আর কখনো ফিরে আসুক—আমি তা চাইনি। সেই পুরোনো কষ্টের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর একটি গভীর ও আন্তরিক আকাঙ্ক্ষা আমার ক্রোধের অন্তরালে লুকিয়ে ছিল। অর্থাৎ, আমার ক্রোধের গভীরে ছিল এমন এক আকুল প্রার্থনা—“আমি আর কখনো সেই কষ্ট পেতে চাই না।” যখন মনের গভীরে এমন কোনো আকাঙ্ক্ষা বা প্রার্থনা থাকে, তখন সেটিকে সচেতনভাবে উপলব্ধি করা এবং আন্তরিকভাবে গ্রহণ করার মাধ্যমে ক্রোধের মূলে থাকা মানসিক ক্ষতকে নিরাময় করা সম্ভব হয়।
আরও এক ধাপ এগিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি, শৈশবে সময়মতো কোনো কাজ করতে না পারার মতো কারণে যেসব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আমাকে কঠোরভাবে বকাঝকা করেছিলেন, তাঁদের ক্রোধের মধ্যেও করুণার উপস্থিতি ছিল। তখন যদি আমি তাঁদের ক্রোধের অন্তরালে থাকা সেই করুণাকে উপলব্ধি করতে পারতাম, তাহলে হয়তো বিষয়টিকে আরও গভীরভাবে বুঝতে পারতাম। সেই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষগুলোর নিজেদের জীবনেও দুঃখ-কষ্ট ছিল। সেই দুঃখের কারণে তাঁরা হয়তো আমাকে সঠিকভাবে পথ দেখাতে পারেননি কিংবা তাঁদের ভালোবাসা প্রকাশের উপযুক্ত পদ্ধতি খুঁজে পাননি। কিন্তু তাঁদের অন্তরের গভীরে আমার সুখ ও কল্যাণ কামনার অনুভূতিও ছিল। বৌদ্ধধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই সত্য উপলব্ধি করাই হলো “ক্ষমা”।
দুঃখ মুক্তির উপায় আর্যসত্যের অনুশীলন বলতে বোঝায়, দুঃখের কারণগুলোর মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন সাধনাকে একটি সুসংবদ্ধ পদ্ধতিতে জীবনে প্রয়োগ করা। দৈনন্দিন জীবনে নিজের মনের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারলে, ক্রোধ বিস্ফোরিত হওয়ার মুহূর্তেই আমরা তাকে সংযত করতে পারি। কিন্তু সেখানেই থেমে থাকলে চলবে না। সাময়িক প্রতিকারের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের করুণার মন ও সমদৃষ্টির পরিধি প্রসারিত করতে হবে। ধীরে ধীরে ক্রোধকে অতিক্রম করার জন্য প্রয়োজনীয় সাধনায় আত্মনিয়োগ করতে হবে। এভাবে অনুশীলন করতে করতে একসময় নিজের ক্রোধকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং সেই ক্রোধের মধ্যেই বোধিসত্ত্বের মহাকামনা বা কল্যাণকামী প্রার্থনা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়। তখন ক্রোধকে কেবল দমন করার মতো কোনো শত্রু হিসেবে না দেখে, বরং নিজেকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে সাহায্যকারী এক শুভমিত্র—“সৎকল্যাণমিত্র” হিসেবে গ্রহণ করতে পারি। এমনকি নিজের অন্তরের ক্রোধকেও নিজের ভেতরের “দেবদত্ত” হিসেবে দেখতে শিখি। এই দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে ক্রোধকে দমন করা কিংবা শত্রু ভেবে তার সঙ্গে লড়াই করার পরিবর্তে, ক্রোধের অন্তর্নিহিত করুণা ও বুদ্ধপ্রকৃতিকে জাগ্রত করা সম্ভব হয়। ফলে ক্রোধ নিজেই ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হতে থাকে।
আগামী পর্বে আমরা “এখানে ও এখন ধর্মের অনুশীলন”—এই দৃষ্টিকোণ থেকে চার আর্যসত্যের তৃতীয় সত্য দুঃখ নিরোধ আর্যসত্য নিয়ে আলোচনা করব। দুঃখের অবসান ঘটলে যে শান্ত, প্রশান্ত ও মুক্তির অবস্থা উপলব্ধি হয়, সেই নিরোধসত্যের তাৎপর্য অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে আমরা এই ধারাবাহিক আলোচনা সমাপ্ত করতে চাই।