জন্ম ও মৃত্যু বিস্ময়কর সত্যের অংশ

রেভারেন্ড নিচিকো নিওয়ানো
প্রেসিডেন্ট, রিস্সো কোসেই-কাই।

মৃত্যুকে অতিক্রম করা

“বৌদ্ধ সাধনার সবচেয়ে অপরিহার্য বিষয় হলো—জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুকে অতিক্রম করা।”— এটি প্রতিষ্ঠাতার ধর্মোপদেশের একটি অংশ, যেখানে বৌদ্ধধর্মের জীবনদর্শন এবং মানুষের মৃত্যু সম্পর্কে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন। ‘মৃত্যু’ হলো মানব জীবনের সবচেয়ে বড় ও গভীরতম একটি ঘটনা। তাই—“মৃত্যুর পর কী হবে?” “আমি মৃত্যুকে ভয় পাই।” “আমি মরতে চাই না।” —এই ধরনের উদ্বেগ, ভয় ও দুঃখকে অতিক্রম করা, অর্থাৎ মৃত্যুভীতিকে জয় করে তার ঊর্ধ্বে উঠতে পারা, নিঃসন্দেহে বৌদ্ধ সাধনার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। মৃত্যুকে ঘিরে থাকা ভয় ও দুশ্চিন্তা অতিক্রম করে অন্তরে শান্তি ও নিশ্চয়তা লাভ করা, একই সঙ্গে নিজের এবং অন্যের সুখ ও কল্যাণ কামনা করে নিজের মন ও শরীরকে পরিশুদ্ধ ও পরিশীলিত করে তোলা—এটাই বৌদ্ধ সাধনার প্রকৃত সারমর্ম।

বৌদ্ধ সাধনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘জীবন ও মৃত্যু’কে আমরা কীভাবে দেখি এবং কীভাবে গ্রহণ করি। ইতিপূর্বে এ বিষয়ে আমি বলেছি—মৃত্যু হলো ‘মহাজীবন’-এর স্বদেশে ফিরে যাওয়া। জীবনের প্রকৃতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমি তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক হারুও সাজি-এর বক্তব্য তুলে ধরেছিলাম, তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বলা যায়, আমাদের জীবন মহাবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো পৃথক সত্তা নয়; বরং আমাদের জীবন মহাবিশ্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। তাই অত্যন্ত জোর দিয়ে বলা যায়—“আমরা প্রতিদিনই অনন্ত জীবন যাপন করছি।”

সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্রের শিক্ষার সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ মহাজাগতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘জীবন’-কে দেখলে, আমরা প্রত্যেকেই এমন এক ‘অনন্ত জীবন’ যাপন করছি, যার সূচনা মহাবিশ্বের সৃষ্টির সুদূর অতীতে এবং যার প্রবাহ ভবিষ্যতের অনন্ত সময় পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জীবনকে গ্রহণ করতে পারলে, মৃত্যুকে ঘিরে উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা ও অজানা ভবিষ্যতের ভয়ও ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে থাকে।

বাস্তব জীবনে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও, বুদ্ধের শাশ্বত জীবন সম্পর্কে বর্ণিত সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্রের প্রতি গভীর বিশ্বাসের মাধ্যমে জন্ম ও মৃত্যুর দুঃখকে অতিক্রম করা সম্ভব বলে মনে করেন জাপানের বিশিষ্ট কবি কেনজি মিয়াজাওয়া। একটি কবিতায় কেনজি লিখেছেন—“আমি অচিরেই মৃত্যু বরণ করব—আজ না হয় কাল।” নিজের অনুভূতি তিনি কবিতায় এভাবে প্রকাশ করেছেন যে—“আমি কি মরে শূন্যতায় ফিরে যাব? নাকি আবার নিজেকে অনুভব করব? …সেই আদি সত্য-ধর্মের নাম—বিস্ময়কর সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্র।” মৃত্যুর পর আমরা মহাবিশ্বের সেই ‘মহাজীবন’-এর কাছে ফিরে যাই এবং পরবর্তীতে আবার নতুন জীবন লাভ করি। এটাই সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্রে প্রকাশিত জীবনদর্শন।

সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্রের শিক্ষার আলোকে অনন্ত জীবনের বিষয় উপলব্ধি করে, অসুস্থতা ও রোগের যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হওযা কেনজি আরও লিখেছিলেন—“জীবনও হলো সেই বিস্ময়কর বিধানের অংশ, মৃত্যুও সেই বিস্ময়কর বিধানের অংশ।” অর্থাৎ, অসুস্থতার মধ্য দিয়ে যাওয়া জীবন; আর নিজের দিকে এগিয়ে আসা মৃত্যু উভয়কেই স্বাভাবিকভাবে গ্রহন করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।

চিরন্তন জীবনকে ধারণ করে পথচলা

মিয়াজাওয়া কেনজি যখন “১৯২৯ সালের ফেব্রুয়ারি” কবিতাটি রচনা করেন, মৃত্যুর প্রায় চার বছর আগে, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র তেত্রিশ বছর। এত অল্প বয়সে জীবন ও মৃত্যুবোধের এমন গভীর উপলব্ধি সত্যিই বিরল। নিঃসন্দেহে, সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্রের শিক্ষা ও বিশ্বাসই তাঁকে এই দৃষ্টিভঙ্গির ওপর দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে সহায়তা করেছিল বলে মনে হয়।

মৃত্যুর পর আমরা কোথায় যাব, কী হবে—তা কেউ জানে না। তবুও আমরা বর্তমানে এবং, মৃত্যুর পরও চিরন্তন জীবনের ধারাতেই অব্যাহত থাকাবো জানলে, অন্তরে এক গভীর প্রশান্তি নেমে আসে। সদ্ধর্ম পুণ্ডরীক সূত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়ে মিয়াজাওয়া কেনজি যে আনন্দ অনুভব করেছিলেন, একই বিশ্বাসের পথে চলা আমরাও সেই আনন্দের স্বাদ লাভ করতে পারি—এ কথা কি আমরা বলতে পারি না?

আমিও একসময় বলেছিলাম, “প্রতিষ্ঠাতার শান্তভাবে জীবনের উৎসভূমিতে ফিরে যাওয়ার দৃশ্য নিজের চোখে দেখে আমার মনে হয়েছিল—‘আহা, আমিও যদি তাঁর মতো শান্তভাবে মৃত্যুকে বরণ করতে পারতাম!’ সেই অনুভূতি আজও আমার মধ্যে অপরিবর্তিত রয়েছে। আমি মনে করি, এটি আমাদের পূর্বসূরিদের জীবন ও জীবনের সত্য সম্পর্কে দীর্ঘদিনের গভীর সাধনা, অধ্যয়ন এবং ধর্মবিশ্বাসের আশীর্বাদেরই ফল।

তবে ‘মৃত্যু’ এমন এক সত্য, যা কারও জন্যই ব্যতিক্রম নয়। নিজের হোক কিংবা প্রিয়জনের—মৃত্যুকে সম্পূর্ণভাবে মেনে নিয়ে তাতে অন্তরের পরিপূর্ণ তৃপ্তি পাওয়া হয়তো সবসময় সম্ভব নয়। আর ঠিক সেই কারণেই “জন্ম, জরা, ব্যাধি ও মৃত্যুকে অতিক্রম করা” মানবজীবনের অন্যতম বৃহৎ সাধনার বিষয় হয়ে ওঠে। আবার, যেহেতু একদিন প্রত্যেককেই মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হবে, তাই এই মুহূর্তে জীবিত থাকার আনন্দকে গভীরভাবে অনুভব করা এবং সেই ‘বর্তমান মুহূর্তটিকে’ বহু মানুষের সঙ্গে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে একসঙ্গে বেঁচে থাকা—এর চেয়ে বড় সুখ আর কী হতে পারে?

তাহলে—বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সূচনালগ্ন থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়ে আসা ‘চিরন্তন জীবনের’ ধারার মধ্যে আমরা কেন ‘জন্ম, জরা, ব্যাধি, মৃত্যু’এর দুঃখকে সঙ্গে নিয়ে এই পৃথিবীতে জীবনযাপন করছি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য আবার অন্য এক সময়ে নতুন করে ভাবতে চাই।